
স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেটের বিয়ানীবাজারে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এক সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে হুমকি, হামলা এবং পরবর্তীতে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বিয়ানীবাজারের বিএনপির নেতা ফখরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে একটি পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন লেখেন পত্রিকার নিজস্ব সংবাদ কর্মী তাহের।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই তাহের নিয়মিত হুমকির মুখে পড়তে থাকেন। তাদের দাবি, গত ৮ ডিসেম্বর রাতে ফখরুল ইসলামের অনুসারীরা তার বাড়িতে গিয়ে হামলা ও মারধর চালায়। এ ঘটনায় তিনি স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তবে অভিযোগ দায়েরের পরও পুলিশের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।
পরবর্তীতে গত ১৫ ডিসেম্বর পারিবারিক কাজে ঢাকায় যান তাহের। কিন্তু ১৭ ডিসেম্বর থেকে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর থেকে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, সংবাদ প্রকাশের জের ধরেই তিনি নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে নিখোঁজের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নিখোঁজ তাহেরের আত্মগোপনে থাকার বিষয়টি নিয়েও পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
উল্লেখ্য, বিয়ানীবাজারে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ফখরুল ইসলামকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ উঠে আসছে, যা বিভিন্ন সময় একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সময়ের সঙ্গে তার রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তিত হলেও এসব অভিযোগের ধারাবাহিকতা রয়ে গেছে। অতীতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অতীতে ও কেউ আমলে নেয়নি । এজন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে বলে তারা মনে করেন।
এদিকে স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছায়ায় একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হচ্ছে বলে তাদের দাবি। কেউ কেউ বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে বিয়ানীবাজারের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লবের ইশারা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পল্লবের অনুসারীরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সক্রিয় থাকায় পুরো কার্যক্রম একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, পল্লব বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার এলাকায় অবস্থান করলেও সেখান থেকেই তিনি এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্থানীয়দের ধারণা, মাঠপর্যায়ের অনেক সিদ্ধান্ত ও তৎপরতা তার নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। তিনি প্রায়ই ফেইসবুকে নিজের উপস্থিতি জানান দেন।
এ বিষয়ে ফখরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার বলয়ের কারণে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো দৃশ্যমান তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় রূপ নেয় না। ফলে ভয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
এছাড়াও এলাকাবাসীর অনেকেই মনে করছেন, আগামীতে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে ফখরুল ইসলাম আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন এবং সে ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসন তার হাতের মুঠোয় চলে যেতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও গভীর হচ্ছে বলে তারা জানান।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1.1K বার