
এডভোকেট মোঃ আমান উদ্দিন:
বেগম খালেদা জিয়া অন্য দশ জন নারীর ন্যায় (১৯৪৫-২০২৫) জন্ম এবং মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে কর্মগুনে হয়েছেন চিরঞ্জিব। রাজনীতিকে করেছেন উর্বর। অধরা শক্তি দিয়ে করেছেন বিশ্বজয়। স্বামী জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া মাটি ও মানুষদের চাহিদার ঠিকানা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দল প্রতিষ্টার মাত্র চার বৎসর পর অসময়ে কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্য জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। কিন্তু তাহার আদর্শে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সাময়িক ক্ষতিগস্থ হয়।
বেগম জিয়া গৃহীনি থেকে স্বামীর আদর্শকে উজ্জিবিত করার জন্য ৩রা জানুয়ারী ১৯৮৪ইং তারিখে সাধারন সদস্য ও ১৯৮৪ সালে বিএনপি এর চেয়ারপার্সন এর দায়িত্ব গ্রহন করেন। (১৯৮৪-২০২৫) মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব থেকে দল ও আদর্শকে কিভাবে সুসংগটিত করা যায় তাহার পথ প্রদর্শক হিসাবে জাতি তাহাকে সর্বোচ্ছ সম্মান দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা জাতির দেওয়া সম্মান কে কবুল করে বেহেস্তের সর্বোচ্ছ স্থানের স্থায়ী বাসিন্দা করিবেন । আমীন । রাজনীতি হচ্ছে নীতিতে অটল থেকে তাহা বাস্তবায়নে অগ্রনী ভূমিকা পালন করা । বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সরকারের দায়িত্ব গ্রহন করেন শেখ মুজিবুর রহমান । ক্ষমতা গ্রহনের পর নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে বাকশাল গঠন করেন যাহার পরিনতি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট । সিপাহী জনতার আন্দোলনে দিশেহারা জাতীকে নেতৃত্ব দিতে ৭ই নভেম্বর কঠিন বিপর্যয় থেকে জিয়াউর রহমান কে উদ্ধার করে রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্টার স্পীরিটকে ধারন করে এক দলীয় শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্টা করেন জিয়াউর রহমান।
বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্টা করেন জেনারেল এইচ এম এরশাদ। দীর্ঘ ৯ বছর জেনারেল এরশাদ স্বৈরাচারীভাবে জনমতকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। বেগম জিয়া বিএনপি এর চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব গ্রহনের পর শপথ করেছিলেন এরশাদের পাতানো কোন নির্বাচনে যাবেন না। কথা রেখেছেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সাধারন নির্বাচনের তপশীল ঘোষনা করিলে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষনা দেন বেগম জিয়া। চট্টগ্রামের লাল দীঘির ময়দানে পাতানো নির্বাচন প্রতিহত করার অংশ হিসাবে যৌথভাবে ৭দল, ৮দল ও ৫দল সভার আয়োজন করেন। ৭ দলের নেতা ছিলেন বেগম জিয়া, ৮ দলের নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা, ৫ দলীয় বামমোর্চা। সভা চলাকালীন স্বৈরচারী কায়দায় সভা প্রসপন্ড করিতে চাহিলে সভা থেকে প্রথম ৭ দলের পক্ষে ঘোষনা দেন বেগম জিয়া। এই অবৈধ সরকারের প্রহসনের নির্বাচনে যাব না যাব না। শেখ হাসিনা ৮ দলের পক্ষ থেকে ঘোষনা দেন এই অবৈধ সরকারের অধীনে যিনি নির্বাচনে যাবেন তিনি হবেন জাতীয় বেঈমান। নির্ধারিত শিডিউল এর শেষ দিন ৭দল থেকে জামায়তে ইসলাম বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেন। তাহারা জনসভায় দেওয়া প্রতিশ্রæতি রক্ষা করতে পারেননি। এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশ ১০টি এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ৮৮টি আসনে পাতানো নির্বাচনে বিজয়ী হন। জনসভায় দেওয়া প্রতিশ্রæতি রক্ষা করতে পেরেছিলেন বলেই বেগম জিয় কে আপোষহীন উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। মূলত তাহারই নেতৃত্বে ও ছাত্র জনতার সহযোগীতার কারনে ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদ গণঅভ্যত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। অবশ্য এ আন্দোলন জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিলেন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ১৯৯১সালে ৩ জোটের রুপরেখা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি মোঃ সাহাব উদ্দিন তাহার দেওয়া শর্ত মেনে অন্তরবর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্টিত হয়। জনাব শাহাব উদ্দিন এর নেতৃেত্বই বাংলাদেশ এর ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহন যোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্টিত হয়। সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করায় বেগম জিয়া সরকার প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী হন। ৩ জোটের রুপরেখা অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনেই প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্টা করেন। ১৯৮৪ সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকার সংবিধানে সন্নিবেশীত করার দাবীতে ১৭২ দিনের হরতাল ও সংসদ থেকে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও তাহার সহযোগীরা। তত্ত¡াবধায়ক সরকার যখন জন দাবীতে পরিনত হয় তখন বেগম জিয়া সেই দাবী মেনে নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারী মাত্র ১৫ দিনের জন্য সরকার গঠন করে তত্ত¡াবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে সন্নিবেশীত করে সংসদ বিলুপ্ত করেন। কথা রক্ষা করেছেন। ১/১১ সরকার প্রতিষ্টিত হওয়ার পর বেগম জিয়া, তারেক রহমান, আরাফাত রহমার খুকু সহ দলীয় নেতা কর্মীদের উপর ব্যাপক অত্যাচার নির্যাতন শুরু হলে তৎকালীন মঈন উদ্দিন – ফখর উদ্দিন সরকার রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় ডিভাইড এন্ড রোলস পলিসি এপ্লাই করে বি এন পি কে বিভিন্ন দল, উপদলে বিভক্ত করার চেষ্টা করে।
এ দিকে বেগম জিয়াকে তৎকালীন সরকার এর পক্ষ প্রস্তাব দেওয়া হয় পরিবারের সকল সদস্যদেরকে নিয়ে দেশ ত্যাগের। সকল লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখান করে নিজ দেশেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত বলে জানিয়ে দেন তাহাদেরকে। অবশেষে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান খুকু এর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সরকার বহিঃ বিশ্বের চাপে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যবস্থা করে। কিন্তু বেগম জিয়া এক কথায় বিশ্বাসী। মরিলে দেশের মাটিতেই মৃত্যুবরন করিব।
ফ্যাসিষ্ট হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহনের পর প্রথমেই পিলখানার ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা ও আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইবুনাল এর মাধ্যমে মিথ্যা মামলায় মৌলানা মোঃ মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, মীর কাশেম আলী, কামরুজ্জামান, আব্দুল কাদির ও সালাউদ্দিন কাদির চৌধুরীকে ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যা ও দেলোয়ার হোসেন সাঈদিকে আমৃত্যু কারাদন্ড প্রদান করে। বেগম জিয়া সরকারের প্রতিটি অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করেন এবং চরম হুশিয়ারী প্রদান করেন। ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান খুকু মৃত্যুবরন করিলে শেখ হাসিনা চরম দৃষ্টতাপূর্ন শয়তানি করার পর ও ধৈর্যহারা হননি। ২০১৩ সালে বিনা ভোটের সরকার, ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে, ২০২৪ সালে আমি ডামির নির্বাচন করে কি শেখ হাসিনা লাভবান হয়েছেন, না কি বেগম জিয়া ? কোটি জনতা বলবেন বেগম জিয়া। এদিকে কথিত দুর্নিতির মামলায় বেগম জিয়ার প্রতি যে অন্যায়ভাবে সাজা দিয়ে শেখ হাসিনা ধারনা করেছিল হয়ত সরকারের সাথে বেগম জিয়া আপোষ করে নির্বাসনে চলে যাবেন। কিন্তু বেগম জিয়া নীতিতে অবিচল থেকে নির্বাকের মতো দেখেছেন শেখ হাসিনা ও তাহার সাঙ্গ পাঙ্গঁরা। চোরের মত দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যাক্তি বেগম জিয়া মৃত্যুবরন করিলে ও দেসবাসী তাহাকে যে বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছেন World Greenwich Book এ লিপিবদ্ধ থাকবে। উল্লেখ করা প্রয়োজন ১৯৯১-২০০৯ সাল পর্যন্ত বেগম জিয়া বাংলাদেশের প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে ৫টি আসনে নির্বাচন করে একটি আসনে কখন ও পরাজিত হননি। এর থেকে প্রমাণিত হয় বেগম জিয়া সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেত্রী হিসাবে বাংলাদেশের জনগণ মূল্যয়ন করিতেন। সুতরাং হালের রাজনীতিবিদদের বলব, বেগম জিয়ার আদর্শকে বুকে ধারন করে রাজনীতিকে জনগণের দারপ্রান্তে পৌছে দিন। তখনই রাজনীতিতে আদর্শবান মানুষরা ঘৃনীত রাজনীতিকে উর্বর রাজনীতিতে যোগদান করিবেন। সুতরাং আদর্শের কখন ও মৃত্যু হয়নি, হবে ইতিহাস। বেগম জিয়া তাহার জানাযাই জলন্ত প্রমান।
লেখক, সভাপতি-সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বিয়ানীবাজার, সিলেট। মোবাঃ ০১৮১৯-১৭৬২১৭
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 988 বার