
স্টাফ রিপোর্টার:
ইউরোপীয় কিছু বিচারক সিলেটের শামীমা বেগমের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে দেখছেন। কিন্তু তার নাগরিকত্ব বাতিলের নিজেদের আদালতের রায় বহাল রাখতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। দেশটির সরকারের একটি সূত্র এমনটিই জানিয়েছে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (ইসিএইচআর) শামীমা বেগমের মামলাটি তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশটির একাধিক আদালত এই রায়কে এরই মধ্যে সমর্থন করেছেন।শামীমা বেগম ১৫ বছর বয়সে পূর্ব লন্ডন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএল) নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে একজন আইএস যোদ্ধার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। শামীমার বয়স এখন ২৬ বছর। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি উল্লেখ করে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু শামীমার আইনজীবীদের দাবি, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি হয়রানি ও পাচারের শিকার হয়েছিলেন কি না, তা বিবেচনা করে দেখা হয়নি।যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ইসিএইচআর জানতে চেয়েছেন, শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তৎকালীন মন্ত্রীরা তিনি পাচারের শিকার কি না এবং তার প্রতি যুক্তরাজ্যের কোনো দায়বদ্ধতা আছে কি না—তা বিবেচনা করেছিলেন কি না।
তবে সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবেন। এই সিদ্ধান্ত আমাদের দেশীয় আদালতগুলোয় বারবার যাচাই করা হয়েছে ও বহাল রাখা হয়েছে।’
সূত্রটি আরও বলেছে, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব সময়ই দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবেন।’ চলতি মাসের শুরুতে ইসিএইচআর কর্তৃক প্রকাশিত একটি নথিতে জানানো হয়েছে, শামীমা বেগম ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের (দাসত্ব ও জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধকরণ) অধীনে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
কে এই শামীমা : শামীমার পিতা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আহমেদ আলী। তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার আশারকান্দি ইউনিয়নের দাওরাই গ্রামের বাসিন্দা। একই গ্রামের আসমা বেগমকে বিয়ে করে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছিলেন আহমেদ আলী। সেখানে আসমা বেগম এবং আহমদ আলী দম্পতির চার মেয়ে। এর মধ্যে শামীমা বেগম সবার বড়।
একপর্যায়ে স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ১৯৯০ সালে আহমদ আলী দেশে চলে আসেন এবং আবার বিয়ে করেন। বর্তমানে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। মাঝেমধ্যে অল্প কিছুদিনের জন্য যুক্তরাজ্যে গেলেও অধিকাংশ সময় দেশে থাকেন। শামীমার সঙ্গে এখন কোনো যোগাযোগ নেই তার। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নেই শামীমার। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট শামীমা বেগমকে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দিতে অস্বীকার করার পর মামলাটি দায়ের করা হয়। শামীমা বেগম যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। ২০১৫ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন থেকে আরও দুই স্কুলবন্ধুর সঙ্গে তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) সমর্থন দিতে সিরিয়ায় পাড়ি দেন।
সিরিয়ায় পৌঁছানোর কিছুকাল পরই শামীমা এক আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করেন। সেখানে তিনি তিনটি সন্তানের জন্ম দিলেও তাদের কেউই বেঁচে নেই। পরে সিরিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে শামীমার খোঁজ পাওয়া যায়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ট্রাইব্যুনাল রায় দেন, শামীমা বেগম ‘বংশসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক।’ তাই তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হলেও তিনি রাষ্ট্রহীন হবেন না।
এই রায়ের বিরুদ্ধে শামীমা বেগম একের পর এক আপিল করেন। শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে তিনি সুপ্রিম কোর্টে এই আদেশ চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাবেন না।
শামীমার আইনজীবী গ্যারেথ পিয়ার্স বলেন, ‘১৫ বছর বয়সী একজনকে যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে প্রলুব্ধ ও উৎসাহিত করা হয়েছিল এবং ধোঁকা দিয়ে বাড়ি থেকে আইএসআইএল-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এ বিষয়ে দ্বিমত করার সুযোগ নেই।’
আইনজীবী আরও বলেন, ‘একই ভাবে এই শিশুটিকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার দীর্ঘ তালিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু একই ভাবে এবং একই পথে সিরিয়ায় নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই কয়েক সপ্তাহ ধরে ওই শিশুটির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টি জানা ছিল।’
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 984 বার