
স্টাফ রিপোর্টার:
দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ‘শোকে স্তব্ধ’ গোটা বিএনপি পরিবার। তাকে হারানো দলের জন্য এক ‘বিরাট শূন্যতা’। এই শূন্যতা দ্রুতই কাটিয়ে উঠতে চায় বিএনপি।
আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় চেয়ারপারসনকে হারানোর এই শোককে ‘শক্তিতে পরিণত করে’ সামনে এগিয়ে যেতে চায় দেশের বৃহত্তর দলটি। ‘খালেদা জিয়া-উত্তর’ যুগে তার পথ ধরেই দল যেন আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র উত্তরণে ভূমিকা রাখতে এবং দেশের সেবা করতে পারে, সেজন্য এখন লক্ষ্য স্থির করা হচ্ছে। খালেদা জিয়া তার ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনে বিএনপিকে তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিয়ে আসেন।বিএনপি মনে করছে, খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তার অবর্তমানেও জনগণের এই ভালোবাসা বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেশের পক্ষের যে শক্তি রয়েছে, তা বিএনপিকে বিজয়ী করবে। আর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাত ধরেই সেটা হবে।আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। বছরের পর বছর অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও যিনি দলের ঐক্যের চূড়ান্ত প্রতীক ছিলেন, সেই নেত্রীকে ছাড়াই এখন নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে দলটিকে। তার প্রয়াণে বিএনপি এখন পুরোপুরি ‘খালেদা জিয়া-উত্তর’ যুগে প্রবেশ করল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখন দলের সব ক্ষমতা এবং জবাবদিহির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন তার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে বিএনপির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এখন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হওয়া এবং কয়েক বছর ধরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল পরিচালিত হওয়ায় খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিটা দলের রাজনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অনেকের অভিমত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা শুধু আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনীতির সম্মুখভাগে অনুপস্থিত থাকার সময়ও তিনি ছিলেন দলের নৈতিক ভারকেন্দ্র এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। তার উপস্থিতির কারণেই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিতে পারেনি এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে কারও মনে সংশয় ছিল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, সাত-আট বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, সুদূর লন্ডনে থেকেও যেভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেখানে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নয়; কিন্তু উনার অভাব সব সময় অনুভব করবে বিএনপি; সেটা আজকেও করবে, কালকেও করবে, দশ বছর পরেও করবে।
তিনি বলেন, বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির ঘন ঘন মিটিং হচ্ছে। যেটা ২০১৮ কিংবা ২০১৪ সালের আগে এভাবে হয়নি। অর্থাৎ বিএনপির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা এখন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে গেছে। খালেদা জিয়া জীবিত ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতেও কিন্তু স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তেই দল পরিচালিত হতো, খালেদা জিয়া হয়তো পরামর্শ দিতেন। এখনো সেই স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তেই বিএনপি পরিচালিত হবে। কিন্তু এখন যেটা হলো—বেগম জিয়ার পরামর্শ, তার অভিভাবকত্ব মিস করবে বিএনপি। কারণ, অসুস্থ থাকলেও তিনি দলের জন্য ‘ছায়ার মতো’ ছিলেন, ঐক্যের প্রতীক ছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে, দল বড় কোনো চ্যালেঞ্জে পড়ে গেছে। বিএনপি আগের মতোই আছে। এখন সামনে জাতীয় নির্বাচন। খালেদা জিয়ার এই ইন্তেকালে তার শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়ার কারাবরণ এবং অসুস্থতাজনিত কারণে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান লম্বা সময় ধরে বিএনপিকে পরিচালনা করেছেন; এটা করতে গিয়ে তিনি নিজেও অনেক বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সুতরাং আশা করছি, তারেক রহমানের পরামর্শ এবং স্থায়ী কমিটির সিদ্ধার্থ মিলে বিএনপি আরও শক্তি, আরও সামর্থ্যের সঙ্গে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাবে।
বিএনপির নেতাকর্মী এবং গণতন্ত্রকামী মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার ভোরে না ফেরার দেশে চলে যান দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাকে হারানো বিএনপির জন্য এক বিরাট শূন্যতা। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর গৃহবধূ থেকে এসে বিএনপির হাল ধরেন। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি আমৃত্যু ছিলেন আপসহীন। তিনিই ছিলেন দলের ‘ঐক্যের প্রতীক’। সে জায়গায় বিএনপিতে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেটা তারা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন এবং খালেদা জিয়াকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যাবেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তা বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেশের পক্ষের যে শক্তি রয়েছে, তা বিএনপিকে বিজয়ী করবে। তিনি বলেন, আগামীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে—এটি মানুষ বিশ্বাস করে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের নেতা তারেক রহমান একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাকে শক্ত মনোবলের অধিকারী হতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। যত শোকই থাকুক, জাতির স্বার্থে তাকে দৃঢ় থাকতে হবে।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মাকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে আগামী নির্বাচনে দলের বিজয় সুনিশ্চিত করতে তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নামবেন। এ ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে এখন কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
নির্বাচনের তপশিল অনুযায়ী, প্রচারণা শুরু হলে সদ্য প্রয়াত মা খালেদা জিয়ার মতো সিলেটে দুই আউলিয়া হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়েই নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করবেন তিনি। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দ হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে প্রচার শুরু হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারে নামার আগে পৈতৃক ভূমি বগুড়ায় যেতে পারেন তারেক রহমান। আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ সংসদীয় আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 983 বার