
স্টাফ রিপোর্টার:
লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল ইসলামের পরিণতি দেখে বিস্মিত হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। যে অভিযানে তিনি নিহত হয়েছেন, তা এখনো রহস্যে ঘেরা। তবে তাঁর পরিণতি অপ্রত্যাশিত নয়।
গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস একবার বলেছিলেন, লিবিয়া থেকে সব সময় নতুন কিছু আসে। এটি কোনো বিস্ময়ের প্রতিশ্রুতি ছিল না। বরং ছিল সতর্কবার্তা। লিবিয়া এমন এক অঞ্চল, যেখানে বিশৃঙ্খলা বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে। আজকের লিবিয়ায় যা দেখা যাচ্ছে, সেটিও পুরোনো ট্র্যাজেডিরই পুনরাবৃত্তি।
সাইফ আল ইসলামের মৃত্যুর চেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো তিনি এত দিন বেঁচে ছিলেন কীভাবে!
সাইফের বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ভাই মুত্তাসিম নিহত হয়েছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়া যা দেখেছে, তা ছিল পূর্বানুমেয়। একটি সমাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলার পর তাঁকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সবাই খুব ছোট ছোট টুকরার জন্য লড়াই করছে।
সাইফ আল ইসলামের বেঁচে থাকা কোনো ব্যক্তিগত শক্তি বা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ফল ছিল না। তিনি টিকে ছিলেন একটি ভঙ্গুর শক্তির ভারসাম্যের কারণে। সাইফ ছিলেন একটি সম্ভাবনা, কোনো বাস্তব বিকল্প নন। দেশীয় ও বিদেশি নানা পক্ষ তাঁকে একটি তুরুপের তাস হিসেবে ধরে রেখেছিল। চাপ সৃষ্টি, দর-কষাকষি কিংবা ব্ল্যাকমেলের কাজে এই তাস ব্যবহৃত হয়েছে; কোনো জাতীয় রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য নয়।
২০১১–পরবর্তী লিবিয়ার কখনোই একজন প্রেসিডেন্ট দরকার ছিল না। তাদের দরকার ছিল আরও কিছু তাস। বিশৃঙ্খল খেলায় যত বেশি তাস, তত সুবিধা। একটি তাসের কাজ শেষ হয়ে গেলে তাকে সরিয়ে ফেলা খেলাটিরই অংশ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সাইফ আল ইসলামের হত্যাকাণ্ড ২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়ায় চলমান সহিংসতার ধারার সঙ্গেই মিলে যায়। যে রাষ্ট্র শক্তি বা বৈধতার একচেটিয়া মালিক হতে পারেনি, সেখানে স্থায়ী সুরক্ষা নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা যে কেউই ঝুঁকির মুখে থাকে। রাজনৈতিক প্রতিশোধ, গোত্রগত প্রতিহিংসা কিংবা অন্যদের উদ্দেশে বার্তা পাঠানো—সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখে।
একসময় সাইফকে হত্যা করতে কেউ আগ্রহী ছিল না। কারণ, তাঁর মৃত্যুর প্রভাব বহন করতে কেউ রাজি ছিল না। সেই ভারসাম্য বদলে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু একটি জটিল সমীকরণের বাস্তব সমাধান হয়ে ওঠে।
গাদ্দাফির শাসন লিবিয়ার সমাধান ছিল না। আবার ২০১১ সালের পর যারা ক্ষমতা দখল করেছে—মিলিশিয়া ও রাষ্ট্র লুটেরারাও কোনো সমাধান নয়। আসলে তারা সমাধান হতে চায়ওনি। ব্যক্তিগত, আঞ্চলিক ও গোত্রগত স্বার্থ সব সময়ই লিবিয়ায় জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। লিবিয়া আজ অনেকটা রোমান দার্শনিক এমিল সিওরানের উক্তির মতো অবস্থায় আছে। তিনি বলেছিলেন, যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না, তাকে শাস্তি হিসেবে নিজের অতীত বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হয়
২০২১ সালে সাবহা থেকে যখন সাইফ আল ইসলাম প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন, তখন সেটি ছিল একধরনের স্বীকারোক্তি। লিবিয়া আর এমন দেশ নেই, যেখান থেকে রাজধানী ছেড়ে পালানো যায়। ত্রিপোলি তাঁর জন্য ছিল না, বেনগাজিও আর নিরাপদ ছিল না। তাই তিনি বেছে নেন মরুভূমি। সেখান থেকেই তাঁর বাবার উত্থান হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর পতন ঘটে। সাবহা কোনো সাধারণ শহর নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ভূগোল। লিবিয়ানরা একে ‘নরকের রাস্তা’ বলে।
সাইফ আল ইসলাম এ জায়গাকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ বানাতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল তাঁর বাবার শেষ প্রচেষ্টার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু বাস্তব লিবিয়া অবস্থান করছে জিনতান ও সাবহার মাঝখানে। লিবিয়া এমন একটি ভাঙা দেশ, যেখানে কেবল ছোট ছোট আনুগত্য টিকে আছে। পূর্ণ বৈধতা নেই কারওই।
যাঁরা লিবিয়ার জাতীয় ভবিষ্যতে বিশ্বাস করেন, সাইফ আল ইসলামকে পছন্দ করুন বা না করুন, তাঁরা জানতেন—তিনি তাঁর বাবার মতো একই ভুল আবার করতেন। জাতির বদলে গোত্রের ওপর ভরসা করতেন।
সাইফ আল ইসলামকে গাদ্দাফি হিসেবে নয়, মরুভূমির মানুষ বা সির্তের সন্তান হিসেবেও নয়, বরং একজন লিবিয়ান হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হতো। কিন্তু লিবিয়ায় জাতি গঠনের পথ শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
২০০০–এর দশকের শুরুতে সাইফ আল ইসলাম নিজেকে পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে শাসনের গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি লকারবি মামলা নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখেন। বুলগেরীয় নার্সদের মুক্তি নিশ্চিত করেন। লন্ডন, প্যারিস ও রোমে ঘুরে বেড়ান সংস্কারপন্থী হিসেবে। তাঁর বাবা তাঁকে চলাচলের কিছু স্বাধীনতা দিলেও প্রকৃত পরিবর্তনের ক্ষমতা দেননি।
একসময় যেসব লিবিয়ান অভিজাত তাঁর ওপর আশা রেখেছিলেন, তাঁরাও সরে দাঁড়ান। তাঁরা বুঝতে পারেন, সাইফের জাতীয় প্রকল্প কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০১১ সালে পূর্ব লিবিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হলে গাদ্দাফি ঘোষণা দেন, সাইফ আল ইসলাম বেনগাজিতে গিয়ে আলোচনা করবেন। কিন্তু তিনি কাউকেই বিশ্বাস করাতে পারেননি। যেমনটি তাঁর বাবা নিজের পতনের সময়টিও বুঝতে পারেননি।
সাইফের ভাই মুত্তাসিম যুদ্ধ করে মারা যান; তাঁর বাবা যেমনটি চেয়েছিলেন। আরেক ভাই সাদি নাইজারে পালিয়ে যান। পরে তাঁকে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং কারাভোগের পর ২০২১ সালে মুক্তি পান। সাইফ আল ইসলাম যুদ্ধ নয়, বেঁচে থাকাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি মৃত্যু এড়াতে পেরেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে বেরোতে পারেননি।
মৃত্যুর আগে লিবিয়ার নির্বাচনী মানচিত্র ছিল খুবই স্পষ্ট। ত্রিপোলিতে তাঁর কোনো ভোট ছিল না। মিসরাতায় তাঁর উপস্থিতি ছিল না। বেনগাজিতে ছিল সামান্য সমর্থন। বাকি ছিল দক্ষিণাঞ্চল ও কিছু শহর, যেগুলো এখনো গাদ্দাফি আমলের রাজনীতির প্রতি অনুগত। ধরুন তিনি যদি দক্ষিণে জিততেনও, তাতেও তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হতেন না। বরং বিভাজনই আরও পুনরুত্পাদিত হতো। ২০১১ সালের পর অন্য সবার মতো তিনিও একই ফাঁদে পড়েছিলেন। সেটি হলো একটি একীভূত জাতীয় প্রকল্পের অনুপস্থিতি।
সাইফ আল ইসলামের কাছে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, সমর্থন ও বৈধতা ছিল না। ইতিহাস তাঁর বিপক্ষে ছিল। ভূগোল তাঁর প্রতি নির্মম ছিল। বিশ্বও তাঁকে কখনো গ্রহণ করেনি। যেসব রাষ্ট্র আরও কম বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে, তারা তাঁর ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি।
১৯১১ সালে লিবিয়া নিয়ে ইতালীয় ইতিহাসবিদ লুইজি ভিলারি লিখেছিলেন, এই ভূমি কাউকে ক্ষমতা দেয় না। কেবল নিয়ন্ত্রণের একটি ভ্রম দেয়। সেই ভ্রম আজও টিকে আছে। সাইফ আল ইসলাম লিবিয়ার সমস্যার উত্তর ছিলেন না। যেমন উত্তর নন আবদুল হামিদ দবেইবা, খলিফা হাফতার, ফাতি বাশাঘা, আলি জেইদান বা আরেফ আল নায়েদ। তবে তাঁর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যখন লিবিয়ানরা এখনো নির্বাচন আয়োজনেই একমত হতে পারেনি, তখন ফলাফল নিয়ে তারা কীভাবে একমত হবে?
সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্রদের একজন সরে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা কমেনি, বরং বেড়েছে। লিবিয়ায় অতীতে ঐক্য কঠিন ছিল। আজও কঠিন। আগামীকাল তা আরও কঠিন হবে।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 987 বার