
স্টাফ রিপোর্টার:
ঈদের ছুটির বিকেল, শনিবার। শহরের ব্যস্ততা আর ক্লান্তি পেছনে ফেলে ব্যবসায়ী অমল বসু পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সবুজের খোঁজে। বহুদিনের লালিত ইচ্ছে—খোলা আকাশের নিচে কিছুটা সময় কাটানো, পাহাড়ি বাতাসে শ্বাস নেওয়া, আর জলপ্রপাতের স্নিগ্ধ স্পর্শ অনুভব করা। গন্তব্য ঠিক হয় মাধবকুণ্ড।
রবিবার সকালে তারা পৌঁছান মৌলভীবাজারে। হালকা নাস্তা সেরে ব্যক্তিগত গাড়িতে আবার রওনা দেন বড়লেখার মাধবকুণ্ডের পথে। পথ যতই এগোতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। সড়কজুড়ে গাড়ির সারি, পর্যটকদের কোলাহল—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, যেন পুরো দেশটাই ছুটে এসেছে এই এক টুকরো প্রকৃতির টানে।
মাধবকুণ্ড ইকোপার্কে ঢুকতেই অন্য এক জগৎ। চারপাশে সবুজের ছায়া, পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলপ্রপাতের গর্জন, আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে এক অদ্ভুত উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। ঈদের আনন্দ যেন এখানে এসে নতুন রূপ পেয়েছে। সিএনজি, মাইক্রোবাস আর বাসভর্তি মানুষ নেমেই ছুটছেন জলপ্রপাতের দিকে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবারের হাত ধরে হাঁটছেন, কেউ আবার জলে নেমে হাসি-আনন্দে মেতে উঠেছেন।
অমল বসু দাঁড়িয়ে দেখছিলেন তাঁর দুই সন্তানের উচ্ছ্বাস। বছরের বেশিরভাগ সময় ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকেন তিনি। এই প্রথমবার পরিবারের সঙ্গে এমন কোথাও আসা। তাঁর চোখে-মুখে তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট। “এই সময়টুকুই তো দরকার ছিল,” তিনি মনে মনে ভাবলেন।
অমল বসু বলেন, প্রথমবার আসলাম । ঈদের উৎসব ঘিরে অনেক মানুষ আসছেন, ভালো লাগছে । ব্যবস্থাপনাটা ভালো লেগেছে । বসার জন্য, বিশ্রামের জন্য পাকা ঘরের শেড নির্মাণ করা হয়েছে । দারুন হয়েছে ।
অন্যদিকে বরিশাল থেকে আসা আব্দুল হাকিম তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে জলপ্রপাতের ধারে বসেছিলেন। দ্বিতীয়বার এলেও জায়গাটার প্রতি টান যেন কমেনি। বরং কিছুটা উন্নয়ন দেখে ভালোই লাগছে তাঁর। পাকা শেড, বসার জায়গা—সবকিছুই আগের তুলনায় অনেক গুছানো। তবে চোখে পড়া কিছু দৃশ্য তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলল। এখানে-সেখানে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট যেন এই সৌন্দর্যের সঙ্গে বেমানান।
“প্রকৃতিটা যদি আমরা নিজেরাই নষ্ট করি, তাহলে এই সৌন্দর্য কতদিন থাকবে?”—স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, ঈদের দিন থেকে শুরু করে রবিবার পর্যন্ত, সকাল থেকেই একের পর এক সিএনজি, মাইক্রোবাস আর বাস এসে থামছে মাধবকুণ্ডের প্রবেশপথে। পরিবার, বন্ধু, স্বজনদের নিয়ে মানুষ ছুটে এসেছে একটুখানি প্রশান্তির খোঁজে। ইকোপার্ক এলাকা যেন মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে এক প্রাণচঞ্চল মিলনমেলায়।
রবিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, জলপ্রপাতের নিচে দাঁড়িয়ে কেউ পানিতে পা ভিজিয়ে শীতলতা উপভোগ করছে, কেউবা সাহস করে নেমে পড়ছে জলে। শিশুরা হাসছে, বড়রা ছবি তুলছে—সব মিলিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই মেলবন্ধন যেন ক্লান্ত জীবনে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে।
এদিকে প্রধান ফটকে দায়িত্বে থাকা রাজু আহমদ ব্যস্ত মানুষের ঢল সামলাতে। ঈদের দিন আর পরদিন মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজারের কাছাকাছি পর্যটক এসেছেন বলে জানালেন তিনি। সামনে আরও ছুটি থাকায় ভিড় বাড়ার সম্ভাবনাও দেখছেন। টুরিস্ট পুলিশ ও কর্তৃপক্ষের লোকজন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন নিরলসভাবে।
দিনের শেষে সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখনও মাধবকুণ্ডে মানুষের ভিড় কমেনি। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু তৃপ্ত মন নিয়ে ফিরছেন সবাই। কেউ স্মৃতি নিয়ে, কেউ ছবির অ্যালবাম ভরিয়ে, আর কেউ হয়তো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—এই সৌন্দর্য যেন অমলিন থাকে।
মাধবকুণ্ড শুধু একটি জলপ্রপাত নয়, এটি যেন মানুষের ক্লান্তি দূর করার এক আশ্রয়। তবে এই আশ্রয় টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা, যত্ন আর ভালোবাসা—সবার।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 983 বার