Daily Jalalabadi

  সিলেট     শুক্রবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ  | ২১শে চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

প্রেসিডেন্টস ডে

admin

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১২:৫৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
প্রেসিডেন্টস ডে

ওয়াহিদুজ্জামান স্বপন:
বছরের ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সোমবার পালিত হয় আমেরিকার প্রেসিডেন্টস ডে। প্রথম প্রেসিডেন্ট, স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির জনক জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিনটিকে ১৯তম প্রেসিডেন্ট রুথারফোর্ড হেইজ ১৮৭৯ সালে ফেডারেল ছুটির দিন ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন সব প্রেসিডেন্টদের জন্মদিনকে উপলক্ষ্য করে প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন ও আব্রাহাম লিংকন এই দুই প্রেসিডেন্টের দুটি জন্মদিনের মাঝামাঝি একটি দিন বছরের ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সোমবারকে প্রেসিডেন্ট ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। ওয়াশিংটন ১৯৩২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের মাউন্ট ভার্ননের ধনাঢ্য কৃষক-পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এবং আব্রাহাম লিংকন ১৮০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

ওয়াশিংটন তার দীর্ঘ সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীকে সুসংগঠিত করে, প্রচণ্ড শ্রম ও সুকঠিন নেতৃত্বে আট বছরের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে, যুদ্ধবিধস্ত দেশটিকে motherland of freedom হিসেবে গড়ে তুলেন। তার অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকেই আমেরিকার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে তার মতো বাস্তব অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ জ্ঞানী, নির্মোহ, নির্লোভ, সাহসী, উদার গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ইতিহাসে বিরল। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে যেমন পারদর্শী ও সফল ছিলেন, ঠিক তেমনি পৈতৃক কৃষি খামারের তত্ত্বাবধানে কৃষক হিসেবেও ছিলেন সমান সফল ও পারদর্শী। পৈতৃক কৃষি খামারের প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড ভালোবাসা। স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন দুই বারের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন বাদে, প্রায়শই সৈনিকজীবনে বিরতি দিয়ে নাড়ির টানে পৈতৃক খামারে কৃষিকাজে নিয়োজিত হয়েছেন এবং ক্রমশ খামারকে বৃদ্ধি করে পর্যাপ্ত সম্পদের মালিকও হয়েছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন সরকার থেকে কোনো রকম বেতন নেননি বরং অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে নিজ কৃষির আয় থেকেই নগদ ২৫ হাজার ডলার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দান করেছেন। এমনকি অনেক যুদ্ধের খরচও তিনি তার নিজ পকেট থেকে দিয়েছেন।

১৭৮১ সালে ব্রিটিশ সেনাপতি কর্নেওয়ালিশের আত্মসমর্পণের পর, সার্বিক যুদ্ধ শেষ করে, ১৭৮৩ সালে তৎকালীন কনটিনেন্টাল কংগ্রেসের কাছে সব ক্ষমতা দিয়ে তিনি চলে যান পৈতৃক বাড়িতে। সহকর্মী অন্যান্য সেনাপতিগণের দেওয়া রাজা হওয়ার পরামর্শ কানে না নিয়ে, ঘোষণাপত্রের মূলমন্ত্র ‘Life, Liberty and pursuit of happiness’-এর ওপর অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে তার সেনাবাহিনীকে কংগ্রেসের কাছে আনুগত্য প্রকাশের নির্দেশ দেন। সহকর্মী ও পরামর্শদাতা রাজনৈতিক দার্শনিক থমাস জেফার্সন ও বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনদের স্বাভাবিক ধারণা ছিল রাজা না হলেও তিনিই হচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। সেটি ছিল রাজার আমল। জুলিয়াস সিজার, নেপোলিয়ান বোনাপার্টসহ সেনাপতিদের যুদ্ধে জিতে রাজা হওয়াই ছিল সে সময়ের রীতি। ক্ষমতালোভী না হয়ে প্রাইভেট জীবনে ফিরে যাওয়ায় স্বয়ং ব্রিটিশ রাজা কিং জর্জ তিন তাকে ‘greatest man in the world’ বলে আখ্যায়িত করেছিল।

ওয়াশিংটনকে বলা হতো ‘আমেরিকান সিনসিনাটি’। ৫০০ বিসি-তে প্রাচীন রোমের প্রচণ্ড প্রতাপশালী সেনাপতি লুসিয়াস সিনসিনাটিই ছিলেন তখনকার একমাত্র নেতা, যিনি যুদ্ধে জয় করে রোমান সাম্রাজ্যকে রক্ষা করে, ক্ষমতায় আসীন না হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়ে নিজের খামারে কৃষিকাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তিনি অতুলনীয় নেতৃত্ব, অসামান্য অবদান, দেশের বৃহত্তর স্বার্থরক্ষা, আদর্শ, মানবিকতা ও নাগরিক গুণাবলির জন্য বিশ্বখ্যাত ছিলেন। ওয়াশিংটনও সিনসিনাটির একমাত্র যোগ্য প্রতিভূ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি সমসাময়িককালের সেনাপতিদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘সোসাইটি অব সিনসিনাটি’ এবং আমৃত্যু এর সভাপতি ছিলেন।

ওয়াশিংটনই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি কোনো রাজনৈতিক দল করতেন না। তার দুই ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও রাজনৈতিক দার্শনিক পররাষ্ট্র মন্ত্রী থমাস জেফারসন ছিলেন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকান ও অর্থমন্ত্রী বেঞ্জামিন ফ্রাংক্লিন ছিলেন ফেডারালিস্ট। দলীয় বিভাজনকে প্রত্যক্ষ করে তার বিদায় ভাষণে রাজনীতিকদের অতিরিক্ত দলীয় প্রীতি, স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা পরিহারের উপদেশ দেন। বিদেশনীতিতেও দীর্ঘদিনের জোট বাঁধাকে অনুত্সাহিত করেন।

ওয়াশিংটন মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান। মেধাবী হলেও পড়াশোনা করেছেন মাত্র ৭ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত। তিনি বাস্তব কাজের মাধ্যমে জ্ঞানার্জনে উৎসাহী ছিলেন। ১৪ বছর বয়সে ট্রান্সলেট করে লেখেন, Set of Moral Precepts এবং Rules of Civility and Decent Behaviour in Company and Conversation বই। তিনি সমাজ তথা কমিউনিটির উন্নয়ন ও গরিব অসহায়দের সহায়তামূলক কাজের জন্য চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। বাল্যকালে তার সত্যবাদিতার জন্য প্রচলিত মিথ হিসেবে বলা হতো, ‘Washington can’t speak lie’।

১৭৮৮ সালে সব অঙ্গরাজ্যের স্বাক্ষরের মাধ্যমে কার্যকর হয় সংবিধান । ১৭৮৯ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে তাকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়। তিনি সহজে তা গ্রহণ করতে চাননি আবার দেশের প্রতি তার দায়িত্ববোধ, তথা দেশটিকে গড়ে তোলার নিজ কর্তব্যকেও অবজ্ঞা করেননি। তাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার খবর নিয়ে আসা কংগ্রেস সেক্রেটারিকে বলেন, ‘While I realize the arduous nature of the task which is conferred on me and feel my inability to perform it, I wish there may not be reason for regretting the choice.’ তিনি দেশকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে এনে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশের স্বার্থকেই সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেন। তিনি নিজ বাসা থেকে তৎকালীন রাজধানী নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রাক্কালে তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘not unlike those of a culprit who is going to the place of his execution’।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ভবিষ্যৎ সফলতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও নিজের অর্জিত খ্যাতি ও সুনামের ওপর চ্যালেঞ্জ হিসেবে তা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১৭৮৯ সালের ৩০ এপ্রিল প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে, নিজ জীবনের সব ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি ও বিলাস স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘I walk on untrodden ground’।

পরবর্তী প্রেসিডেন্ট তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট জন আডামস তার ফেয়ার ওয়েলে দেওয়া যুগান্তকারী ভাষণটিকে রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিষয় ও দেশ পরিচালনার মূলমন্ত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পাঠ্য করেন। অবসরে যাওয়ার মাত্র তিন বছর পর ১৭৯৯ সালের ডিসেম্বরে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান।

লেখক: বাংলাদেশি আমেরিকান

 

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1.1K বার

শেয়ার করুন