
স্টাফ রিপোর্টার:
দুই বছর কেটে গেছে। কিন্তু রাজবাড়ীর টাকাপোড়া গ্রামের একটি পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই দিনেই। দুই বছর আগে জুলাই মাসেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজের শিক্ষার্থী সাগর আহমেদ (২১)। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু সন্তানের শূন্যতা, বিচার না পাওয়ার বেদনা আর তার স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা আজও একই রয়ে গেছে পরিবারের কাছে।
সাগর আহমেদ রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের টাকাপোড়া গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেনের ছেলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকার মিরপুর গোলচত্বরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। সেই ঘটনার দুই বছর পূর্তিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে না পাওয়া বিচার, অপূরণীয় শোক আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প।
সাগরের মা গোলাপী বেগম বলেন, জুলাই মাস এলেই আমার সব স্মৃতি ফিরে আসে। মনে হয় এই তো সেদিন আমার ছেলেটা ছিল। মানুষ বলে সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়, কিন্তু সন্তানের শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হয় না। প্রতিটি মুহূর্তে আমি আমার সাগরকে অনুভব করি।
তিনি বলেন, আমি চাই আমার ছেলেকে মানুষ মনে রাখুক। তাই নারুয়া লিয়াকত আলী স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এবং উপজেলা মডেল মসজিদের নাম সাগরের নামে করা হোক। মানুষ যখন তার নাম উচ্চারণ করবে, তার জন্য দোয়া করবে—এটাই হবে একজন মা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
সাগরের বাবা তোফাজ্জেল হোসেনের কণ্ঠেও ছিল একই বেদনা। তিনি বলেন, সন্তান হারানোর কষ্ট কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। দুই বছর ধরে প্রতিদিন সেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি। আমার ছেলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তার আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন হোক, বিচার হোক—এটাই আমাদের চাওয়া।
পরিবারের অভিযোগ, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। মামলার বাদী ও সাগরের চাচাতো ভাই মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা ভেবেছিলাম দ্রুত বিচার হবে। কিন্তু এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। এতে পরিবার হিসেবে আমরা হতাশ। আমরা চাই দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক কৃঞ্চ দাস জানান, মামলাটি সম্প্রতি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও ঠিকানা সংগ্রহ, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের কাজ চলছে। বাদীপক্ষকেও তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ শেষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজবাড়ীর জুলাই যোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আলতাব হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তারা দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন। শহীদ সাগর আহমেদের মতো তরুণদের আত্মত্যাগ জাতি কোনোদিন ভুলবে না। আমরা চাই, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচার নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্র কার্যকর উদ্যোগ নিক, যাতে আগামী প্রজন্ম তাদের আত্মত্যাগ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে।
প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার মিরপুর গোলচত্বরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ২১ বছর বয়সী সাগর আহমেদ। পরদিন ২০ জুলাই নিজ গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বিল টাকাপোড়া কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় সাগরের আপন চাচাতো ভাই মো. সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে ঢাকার মিরপুর মডেল থানায় ৪৮৬ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ২০০/৩০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1K বার