
মিলাদ জয়নুল:
সকাল শুরু হয় ব্যস্ততা দিয়ে, তারপর দ্রুত ছুটে যাওয়া নিজ কর্মস্থলে। কেউ আবার শিশু সন্তানের স্কুলের টিফিন তৈরীতে ব্যস্ত। পুরোটা দিন কাটে কর্ম আর সংসার গোছানোর দায়িত্বে। এরপরও দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবার ফিরে যেতে হয় সংসারের অসংখ্য দায়িত্বে। কোন ক্লান্তি নেই মায়েদের, মুখে থাকে মমতার হাসি।
কর্মজীবি নারীদের কেউ ফোনে খোঁজ নিচ্ছেন বাসায় থাকা সন্তানের আবার কেউ বোর্ডে পাঠ লিখছেন। একজন কর্মজীবী মা, প্রতিদিনই একসঙ্গে বহন করেন পরিবার ও পেশার দুই বিশাল দায়িত্ব। আবার গৃহিণী মা সামলান সংসার-সন্তানের মহারাজ্য।
মা দিবসকে ঘিরে বিয়ানীবাজারের কয়েকজন মায়ের না বলা গল্প এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
উম্মে হাবিবা মজুমদার
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বিয়ানীবাজার
উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, একটি পরিবার তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন তার কেন্দ্রে সবাইকে আগলে রাখার মতো একজন মা থাকেন। মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ। মা সবসময় সন্তানের ভালোর জন্য দোয়া করেন। মায়েদের কোনো বিকল্প নেই। মা হলেন সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতীক। মা নিজের সুখ-শান্তি ভুলে সন্তানকে আগলে রাখেন। মাকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিনের প্রয়োজন নেই; প্রতিটি দিনই মায়ের দিন। তবে এই দিনটি মায়েদের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়।
তিনি বলেন, মাত্র ১৫ মাসের দুই জমজ বাচ্চাকে বাসায় রেখে সকালে বের হই। আর কখন যে বাসায় ফিরি তা নিজেই বলতে পারিনা। উপজেলা কমপ্লেক্সের সরকারি বাসায় আমার বাচ্চারা বড় হচ্ছে অথচ আমি সময় দিতে পারছিনা। যেদিন সিলেট শহরে যাই সেদিন ভিডিও কলে বাচ্চাদের দেখি। এ এক কঠিন অনুভূতি। আমার অনুপস্থিতিতে বাচ্চারা কিভাবে খাচ্ছে, বড় হচ্ছে-তা ভাবাও বেশ কঠিন। আমার বাসায় নিজস্ব কোন লোক নেই। অন্যের কাছে বড় হচ্ছে আমার সন্তানরা। আমার সন্তানরা মাকে সবসময় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে পারে না, কারণ সন্তানের আশ্রয়স্থল হলো মা। তারা মায়ের কাছেই সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছলতা ও নিরাপত্তা অনুভব করে।
সরকারি কাজে যখন বাসা থেকে বের হই তখন বাচ্চাদের মন খারাপ হয়। বাসায় ফেরার পর তারা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে বলে যোগ করেন ইউএনও। সরকারি অন্য কর্মকর্তারা বন্ধের দিনে পরিবারকে সময় দেয়ার সুযোগ পায় কিন্তু আমি তাও পাইনা।
ডা: ফাহিমা শিরিন
চিকিৎসক
ডা: ফাহিমা শিরিন বলেন, যত ব্যস্ত থাকি না কেন বাচ্চাকে সময় দেয়ার চেষ্টা করি। চেম্বার, হাসপাতাল-এর মাঝেও বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে যাই। মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রতিদিন হওয়া উচিত। মায়ের মতো আপনজন পৃথিবীতে আর কেউ হয় না। মায়ের কোনো বিকল্প হয় না। মা সবার জীবনের প্রথম শিক্ষক। সারাজীবন সন্তানের বিপদ-আপদে মা বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন। আমাদের জীবনে প্রতিটি দিনই যেন ‘মা দিবস’ হয় এই আশাই ব্যক্ত করছি।
তিনি বলেন, একজন মা তার সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে পারেন। কারণ তিনি তো মা। কাজেই মা দিবসে মাকে ‘ভালোবাসি’ বলাটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। সন্তানরা সবসময়ই মাকে ভালোবাসে। যখন মা দিবস ছিল না, তখন হয়তো বলা হতো না যে ‘মা তোমায় অনেক ভালোবাসি’। একটি মা দিবস আছে বলেই আজ হয়তো বিশেষভাবে বলা যাচ্ছে। এই দিন সন্তানরা মাকে খুশি করার জন্য মাকে গিফট দেই। মা ও সন্তানের এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অনেক স্নেহ মমতা ও অনুভূতি প্রকাশ পায়।
সুহানা আক্তার সুমি
শিক্ষিকা
নিদনপুর-সুপাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষিকা বলেন, স্কুলে যাওয়ার সময় সন্তানদের বাড়িতে রেখে যাই। এ সময় তারা খুব একাকীত্ব অনুভব করে। বিকেলে যখন ফিরি তখন খুশী হয় বাচ্চারা। শুক্র-শনিবারে সন্তানদের একান্তে সময় দেয়ার চেষ্টা করি। আবার কর্মদিবসে একা থাকে বাচ্চাগুলো।
তিনি বলেন, সন্তান পৃথিবীতে আসার পর থেকেই মায়েদের ত্যাগের সূচনা হয়। নিজের আরাম-আয়েশ, শখ কিংবা বিশ্রামের কথা চিন্তা না করে তারা কেবল সন্তানের সুস্থতা ও ভবিষ্যতের কথা ভাবেন। বলা যায়, মায়েরা নিজের জন্য নয়, বরং সন্তানের ভালোর জন্যই বেঁচে থাকেন। মা যখন পথ চলা শুরু করতে শেখান, তখন থেকেই শত বাধা ও প্রতিকূলতার মাঝেও মাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। মায়ের বৃদ্ধ বয়সে মায়ের সেবা করা এবং দেখাশোনা করা সন্তানের দায়িত্ব। মায়ের ছোট ছোট বিষয়গুলোতেও খেয়াল রাখা উচিত। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় সন্তানরা মায়ের এই বিষয়গুলোতে খেয়াল করতে পারছে না। অনেক সময় এগুলো ইচ্ছাকৃত হয়, আবার অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে।
বুশরা ইসলাম
গৃহিণী
বুশরা ইসলাম জানান, সকালে ঘুমথেকে ওঠেই বাচ্চাদের স্কুলে দেয়ার হুড়োহুড়ি। কারো জন্য নাস্তা কারো জন্য টিফিন রেডি করতে হয়। গৃহিণী হওয়ায় বাচ্চাদের সময় দিতে পারি। দিনের বেশীরভাগ সময় তাদের যত্ন নেয়া সম্ভব হয়।
তারমতে, পৃথিবীর নিয়মে সন্তান হয়তো অনেক সময় অনেক কারণে মায়ের থেকে দূরে সরে যায়, কখনো কখনো তাদের ভালোবাসায় ঘাটতিও দেখা দেয়; কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কখনো কমে না। শত অবহেলা বা দূরত্বেও মায়ের মমতা সারাজীবন একই থাকে। মায়ের প্রতি ভালোবাসা একদিনে বা এককথায় প্রকাশ করার মতো কোনো বিষয় নয়। কারণ মায়ের মমতা আমাদের সারা জীবনের পাথেয়। তবুও বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে মা দিবস পালনের একটি বিশেষ ইতিবাচক দিক রয়েছে।
জুবেদা আক্তার
গৃহিণী
জুবেদা আক্তার বলেন, মা হিসেবে আমি শিখেছি ধৈর্য, সহনশীলতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ। সন্তানের মুখের হাসি আমাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছে। জীবনের প্রতিটি বাধা পেরিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি একজন মা নিজের ভেতরে এমন এক শক্তি ধারণ করেন, যার সম্পর্কে হয়তো তিনি নিজেও অবগত নন।
তিনি বলেন, ভোর থেকে সন্তানদের ভালোর জন্য ছুঠে চলা। তাদের নানা বাহানা পূরণ করতেই দিন কেটে যায়।
জগতের অন্য সব সন্তানদের মাঝেও মায়েরা নিজের সন্তানকেই খুঁজে বেড়ান। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মেজোদিদি গল্পের একটি বিখ্যাত উক্তি ‘কেষ্টের কষ্ট দেখে হিমাঙ্গিনীর মাতৃত্ব জাগিয়া উঠিল’ তবে জীবনের এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি হলো, সন্তান যখন বড় হয় বা কিশোর বয়সে পা দেয়, তখন অনেকেই মায়ের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারে না। মায়ের এই সুগভীর অনুভূতি বা ত্যাগ আসলে ভাষায় লিখে বা মুখে বলে শেষ করা সম্ভব নয়। এটি এমন এক ঋণ, যা কোনোদিন শোধ করা যায় না, কেবল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1K বার