নতুন বছরের আগমনীসুর যেন এরইমধ্যে ভেসে উঠেছে বাতাসে। পুরনো বছরের জীর্ণতা, গ্লানি ও শোককে বিদায় জানিয়ে আজ (মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল) শুরু হচ্ছে নতুন প্রাণের উৎসব- পহেলা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ঋতুচক্রের নবায়নের মতোই এ উৎসব বয়ে আনে আশা, পুনর্জাগরণ ও ঐক্যের বার্তা।
হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই দিনটি জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাদেশি একযোগে মেতে উঠবে বাংলা বর্ষবরণের আনন্দে।
অন্তরের গভীরে লালিত দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রকাশ পায় এই দিনে। প্রত্যাশা- অশুভ ও অসুন্দর দূরীভূত হোক, সত্য ও সুন্দরের জয়গান প্রতিধ্বনিত হোক সর্বত্র; বিদায়ী বছরের সব দুঃখ-বেদনা মুছে যাক।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বার্তায় বাংলা নববর্ষে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
বাংলা নববর্ষ প্রাণের সর্বজনীন উৎসব। এটি ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত-এ কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জাতি, ধর্ম ও বর্ণেও ভেদাভেদ অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ আমাদের সবার জন্য হয়ে ওঠে এক আনন্দ ও মিলনের দিন। আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের ধারক ও বাহক হিসেবে এ উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশাখের আগমনে আমাদের জীবনে জাগে নতুন প্রত্যাশা, নব প্রতিশ্রুতি ও অসীম সম্ভাবনার স্বপ্ন। অতীতের গ্লানি, বেদনা ও ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চলি নব উদ্যমে ও নব প্রত্যয়ে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর ফিরে আসে নতুনের আহ্বান নিয়ে। নতুন বছরের আগমনে পুরোনো জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।’
‘পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ’ উপলক্ষে সোমবার (১৩ এপ্রিল) দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আমাদের এ অঞ্চলের কৃষি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্পর্ক নিবিড়। তথ্যপ্রযুক্তির এই সুবর্ণ সময়েও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কৃষক তার ফসল উৎপাদনের দিনক্ষণ ঠিক করে। বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে নতুন করে উজ্জীবিত হয়।’
শহরের পাশাপাশি গ্রামবাংলাও প্রস্তুত বর্ষবরণের উচ্ছ্বাসে। নানা বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুরা বর্ণিল পোশাকে উদযাপন করবে দিনটি। বসবে বৈশাখী মেলা; আয়োজন থাকবে বলিখেলা, লাঠিখেলা ও হা-ডু-ডু’র মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সারাদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করবে। এদিকে জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
নববর্ষের এই প্রভাতে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আবারও উচ্চারিত হবে বাঙালির চিরন্তন আহ্বান- নতুনের জয়, মানবতার জয়।
সিলেটে নানা আঢেয়াজন
সিলেটে নানা আয়োজনে বরণ করে নেওয়া হবে বাংলা নতুন বছরকে। মঙ্গলবার বছরের প্রথম দিনে প্রাণের উৎসবে মাতবে সিলেটও।
বর্ণাঢ্য আয়োজনে নতুন বছরকে বরণে নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে সিলেটের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। সিলেটের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজ ক্যাম্পাসেও পহেলা বৈশাখে বর্ণিল আয়োজনে বরণ করা হবে নতুন বছরকে। এসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে জোরেসোরে।
আনন্দলোক: প্রতিবছরের মতো এবারও শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আনন্দলোক, সিলেট।
মঙ্গলবার সকাল ৮টায় শুরু হয়ে এ আয়োজন চলবে বেলঅ ২ টা পর্যন্ত।
শ্রুতি: বর্ষবরণে এবারও দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রুতি, সিলেট।
ব্লু বার্ড স্কুল মাঠে মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত চলবে শ্রুতির বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
চারণ: নগরের চৌহাট্টা এলাকার লোলানন্দ নৈশ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দিনব্যাপী বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করেছে চারণ, সিলেট। সকাল ৯টায় শুরু হয়ে এ উৎসব শেস হবে বিলে ৫টায়।
সিলেট আর্টস কলেজ: সিলেট আর্টস কলেজ, সিলেট আর্ট অটিস্টিক স্কুল ও সিলেট আর্ট স্কুলের যৌথ উদ্যোগে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নগরের কুমারপাড়ায় সিলেট আর্টস কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রার মাধ্যমে শুরু হবে এ অনুষ্ঠান।
এরপর ১১ থেকে ১ টা পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাসে চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাথে থাকছে বৈশাখী চিত্র প্রদর্শনীও।
এছাড়া প্রতিবছরেরর মতো এবারও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমসি কলেজে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে ঢল নামবে তারুণ্যের।
এদিকে, বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে সকাল ৮টায় বৈশাখী শোভাযাত্রা বেকর করবে সিলেট সিটি করপোরেশন। আর চাঁদনীঘাট এলাকায় বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে, সোমবার বছরের শেষ দিনে নগরের চাঁদনী ঘাটের সিঁড়িতে বর্ষবিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, সিলেট। বেলা ৩ টায় শুরু হয়ে এ অনুষ্ঠান চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।