Daily Jalalabadi

  সিলেট     মঙ্গলবার, ১৬ই জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২রা আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিয়ানীবাজার সড়ক ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের শিকড় সন্ধানে পুলিশ

admin

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৫ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
বিয়ানীবাজার সড়ক ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের শিকড় সন্ধানে পুলিশ

 

মিলাদ জয়নুল:

কেউ বলেন ‘বিচি’, কেউ ‘বোতাম’। আবার কেউ কেউ ‘মাল’ নামেও ডাকেন। বিচি, বোতাম ও মাল-এ তিন নামেই ভারত থেকে বিয়ানীবাজার থানার প্রতিবেশী জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে ইয়াবা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ইয়াবাকে এ তিনটি সাংকেতিক নামেই ডাকেন মাদক কারবারিরা। আর এসব নামে ডেকে বোকা বানানো হচ্ছে আইনশৃংখলা বাহিনীকে।

সম্প্রতি জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইয়াবার এ তিনটি ‘সাংকেতিক’ নাম পাওয়া গেছে। আর প্রতিবেশী সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ঢুকিয়ে বিয়ানীবাজারের রুট ব্যবহার করে অন্যত্র তা পাচার করা হচ্ছে। ইয়াবার কোন চালান আবার বিয়ানীবাজারের মাদক কারবারিদের হাতেও পৌছাঁনো হচ্ছে। তবে বিয়ানীবাজারকে ট্রানজিট পয়েন্ট না বানাতে ব্যাপক তৎপর আইনশৃংখলা বাহিনী। গত কয়েকদিন থেকে পুরো উপজেলায় গোয়েন্দা নজর বৃদ্ধি করা হয়েছে। সমানতালে চলছে তল্লাশি-অভিযান। ইয়াবা উদ্ধারের পাশাপাশি গ্রেফতার করা হচ্ছে জড়িতদের।

বিগত সরকারের সময় থেকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে চিনিকাণ্ড আলোচনায় থাকায় অনেকটা চাপা পড়ে মাদকবিরোধী অভিযান। যে কারণে ‘নিরাপদ রুট’ হিসেবে জকিগঞ্জ সীমান্তকে ব্যবহার করছেন চোরাকারবারিরা।

বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হচ্ছে। তারপরও থেমে নেই চোরাকারবারিরা। অত্যন্ত কৌশলে কয়েক হাত বদল করে জকিগঞ্জ থেকে বিয়ানীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন এসব মাদক। এতে ‘সাপ্ল­াইয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে অসহায় ও হতদরিদ্র কিছু যুবককে। বিনিময়ে তাদের দেওয়া হয় চালানপ্রতি আর্থিক সুবিধা। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছেন কেবল ‘সাপ্লাইয়াররা’। ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন মূল হোতারা।

সম্প্িরত বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ ৯ হাজার পিস ইয়বাসহ একজনকে গ্রেফতার করে। মঙ্গলবার থানা পুলিশের অভিযানে ৫০ পিস ইয়াবাসহ ৩ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার করা হয়। জকিগঞ্জ-চারখাই-বিয়ানীবাজার সড়ক ব্যবহার করে তারা ইয়াবা বহন করছিল।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ বৈরাগীবাজার এলাকার আব্দুল্ল­াহপুর ত্রিমুখী পয়েন্ট যাত্রী চাউনীর সামনে চেকপোস্ট পরিচালনা করে। এ সময় জকিগঞ্জের জামবর গ্রামের মৃত আছান আলীরছেলে মোহাম্মদ আলী (৫০), মাথিউরা খলাগ্রামের মৃত আব্দুস শুকুরের ছেলে আব্দুল বাছিত (৩৮) ও পৌরসভা এলাকার রাঙ্গাউটি গ্রামের মৃত খতিব আলীরছেলে মোঃ জিবার হোসেন (৪৫)’কে গ্রেফতার করা হয়।

বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ মো:ওমর ফারুক বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের আলোকে আমাদের কাছে মাদক কারবারিদের তালিকা আছে। আমরা সেই আলোকে অভিযান পরিচালনা করি। মাঝে মধ্যে গভীর রাতে চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান পরিচালনা করি।’ অভিযানে মাদকের বাহক ধরা পরার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন অভিযান পরিচালনা করা হয় তখন মূলত বাহকই ধরা পড়ে। আমরা পরবর্তীতে ওই বাহককে মামলা দিয়ে আদালতে হস্তান্তর করি।’

 

যেভাবে সীমান্ত পার করা হয় ইয়াবার চালান

 

জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের জিরোপয়েন্ট থেকে কসকনকপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত পর্যন্ত সবকটি এলাকা মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট। স্থানীয় চোরাকারবারিরা সীমান্তের ওপার থেকে বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবা নিয়ে আসেন। পরে অত্যন্ত কৌশলে সারাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইয়াবা। সীমান্ত এলাকার একাধিক সূত্র জানায়, মূলত তিনটি কৌশলে সীমান্তের কাটাতারের বেড়া ও নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে ইয়াবা। দিনের বেলা জেলে সেজে নদীতে নৌকা দিয়ে মাছ ধরার সময়, রাতের বেলা নদীতে ভাসিয়ে এবং রাতের আঁধারে সাঁতার কেটে ও নৌকা দিয়ে নদী পার হয়ে ইয়াবা নিয়ে আসেন চোরাকারবারিরা। পরে এগুলো সামীন্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে রাখা হয়। সেখান থেকে বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীদের এজেন্টের হাতে তুলে দেন স্থানীয় চোরাকারবারিরা। পরে যাত্রীবেশে গণপরিবহনে করে নিয়ে যান গন্তব্যস্থানে।

রাতে নৌকায় নদী পার হয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশ থেকে ইয়াবা নিয়ে আসেন বাংলাদেশিরা। এক্ষেত্রে ভারতের চোরাকারবারিরা ইয়াবার চালান কাঁটাতার অতিক্রম করে দেন।

 

সূত্র জানায়, ভারত থেকে আনার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন স্থানীয় কারবারিরা। পরে সেখান থেকে স্থানীয় বিভিন্ন বাজার বা কোলাহলপূর্ণ এলাকায় অন্য ব্যবসায়ীর এজেন্টের কাছে তুলে দেন স্থানীয় কারবারিরা। চোরাচালানের পুরো প্রক্রিয়াতে কেউই ‘ইয়াবা’ নামটি ব্যবহার করেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ইয়াবা শব্দ ব্যবহার না করে সাংকেতিক নাম হিসেবে ‘বিচি’, ‘বোতাম’ ও ‘মাল’ নামে ডাকা হয়। এতে করে প্রকাশ্যে ইয়াবার ব্যবসা করা হলেও কেউই টের পান না।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইয়াবার চালান বুঝে নেওয়ার পর বড় ব্যবসায়ীর এজেন্টরা বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সাধারণ যাত্রীবেশে গন্তব্যে রওয়ানা হন। ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে গণপরিবহনে ওঠার আগে পরনের কাপড় বদলে ফেলেন তারা। এতে গোপন তথ্য পেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের শনাক্ত করতে পারেন না।

 

বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৩ মাসের ব্যবধানে এই থানায় মাদক আইনে অন্তত: দুই ডজন মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মাদক বিরোধী অভিযানে স্থানীয় পুলিশের ব্যাপক অভিযান জনমনে প্রশংসিত হচ্ছে। এরপরও এলাকাবাসীর দাবী, ইয়াবাসহ মাদক পাচারের রুট বিয়ানীবাজারকে নিরাপদ রাখতে বড় কারবারি এবং তাদের এজেন্টদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1K বার

শেয়ার করুন